দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলে এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষককে মারধরের ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। হামলার শিকার শিক্ষক শাহ আলমের পরিবারের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের পুকুরের লিজের টাকা নিয়ে স্থানীয় এক সাবেক ইউপি সদস্যের সঙ্গে তার বিরোধ চলছিল। এর জেরেই পরিকল্পিতভাবে ‘মব’ তৈরি করে শিক্ষককে মারধর এবং পরে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তোলা হয়েছে।
তবে সাবেক ইউপি সদস্য ইলিয়াস মোল্লা এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, শিক্ষক শাহ আলমকে তিনি চেনেন না এবং তার সঙ্গে কখনো কোনো বিরোধও হয়নি।
ঘটনাটি ঘটেছে কালীগঞ্জ উপজেলার বড় বায়শা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। গত মঙ্গলবার স্থানীয় ১০-১২ জন লোক বিদ্যালয়ের অফিসকক্ষে ঢুকে সহকারী শিক্ষক শাহ আলমকে মারধর করেন। চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলে এ হামলা চালানো হয় বলে জানা গেছে।
পরে শিক্ষককে অফিসকক্ষে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। খবর পেয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, থানার ওসি ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করেন। পরে পুলিশ শাহ আলমকে হেফাজতে নেয়। সন্ধ্যায় অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তিনি পুলিশ পাহারায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এ ঘটনায় ছাত্রীর মায়ের অভিযোগের ভিত্তিতে শিক্ষক শাহ আলমকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে মামলা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তবে ঘটনাস্থলে দেওয়া অভিযোগপত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রোকনুজ্জামান বলেন, স্থানীয়দের কাছে লিখিত অভিযোগ চাইলে তারা কিছুক্ষণ পর সাদা কাগজে হাতে লেখা একটি অভিযোগপত্র দেন। ওই চিঠিতে শিক্ষার্থীর স্বাক্ষর বা তার পক্ষে কারও স্বাক্ষর ছিল না।
তিনি বলেন, চিঠিটি ওই শিক্ষার্থীর নিজের হাতে লেখা কি না, তা তিনি নিশ্চিত নন। শিক্ষার্থীও তার সামনে এসে কোনো অভিযোগ করেনি। তার চাচা সৌরভ সরকার তার কাছে অভিযোগপত্রটি দেন।
অভিযোগের বিষয়ে সৌরভ সরকার বলেন, তার ভাতিজির সঙ্গে অন্যায় হয়েছে এবং তারা এর বিচার চান। তবে হাতে লেখা অভিযোগপত্র কে লিখেছে, তা তিনি জানেন না বলে জানান। তার ভাষ্য, হয়তো অন্য কেউ ছাত্রীর কথা লিখে দিয়েছে।
শিক্ষকের পরিবারের দাবি, ঘটনার পেছনে বিদ্যালয়ের পুকুরের লিজের টাকা নিয়ে বিরোধ রয়েছে। শিক্ষক শাহ আলমের স্ত্রী তানিয়া সুলতানা বলেন, রামচন্দ্রপুর গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য ইলিয়াস মোল্লা বিদ্যালয়ের পুকুরের লিজের টাকা চেয়েছিলেন। তার স্বামী বিদ্যালয়ের টাকা অন্য কাউকে না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়ায় গত দুই সপ্তাহ ধরে বিরোধ চলছিল।
তানিয়া সুলতানার অভিযোগ, স্থানীয় সৌরভ সরকার ও ইলিয়াস মোল্লার একটি প্রভাবশালী চক্র রয়েছে। তারা বিদ্যালয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছিল। শিক্ষক এতে বাধা দেওয়ায় তাকে পরিকল্পিতভাবে হামলা করা হয়েছে এবং পরে ঘটনাটিকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ হিসেবে সামনে আনা হয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজনের ভাষ্য, বিদ্যালয়ের আশপাশের অনেকেই ঘটনার আগে বিষয়টি জানতেন না। সাবেক ইউপি সদস্য ইলিয়াস মোল্লা ঘটনার আগে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পিয়ার মোহাম্মদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। এর কিছুক্ষণ পরই স্থানীয় লোকজন বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষককে মারধর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে ইলিয়াস মোল্লা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “আমি শিক্ষক শাহ আলমকে চিনিই না। তার সঙ্গে আমার কখনো কথাও হয়নি। স্কুলের পুকুরের লিজের টাকা আমি কেন নিতে চাইব? আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করা হচ্ছে।”
তবে হামলার আগে প্রধান শিক্ষককে সতর্ক করার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, এলাকার লোকজন ঝামেলা করতে পারে এ কথা তিনি প্রধান শিক্ষককে জানিয়েছিলেন।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পিয়ার মোহাম্মদ বলেন, ইলিয়াস মোল্লা তার চাচা শ্বশুর। তবে তিনি বিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার আগে পুকুরের লিজের টাকা নিয়ে কোনো বিরোধ হয়েছিল কি না, তা তার জানা নেই। হামলার বিষয়ে তিনি বলেন, অফিসে প্রবেশের পরপরই স্থানীয় লোকজন শিক্ষক শাহ আলমের ওপর হামলা করে। কেন হামলা হয়েছে, তা তিনি জানেন না।
এদিকে ঘটনার বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়েছে। শিক্ষকসহ সচেতন মহলের অনেকে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম লিকু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ব্যক্তিগত ও সামাজিক বিরোধের জেরে শিক্ষকদের হয়রানি ও সম্মানহানি করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে শিক্ষকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন হাছান বলেন, ছাত্রীর মায়ের অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা হয়েছে। বিষয়টি সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের অফিসে ঢুকে শিক্ষকের ওপর হামলার ঘটনায় কেউ অভিযোগ দিলে সেটিও তদন্ত করা হবে।
তিনি বলেন, “আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই।”
যে আই